সাক্ষাৎকার : নুরুল হক নুর, ডাকসুর সাবেক ভিপি

স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ডাকসু চায় না সরকার

ডিউ নিউজ ডেস্ক / ৫১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদ কার্যকর থাকুক, সরকার এটা চায় না। তারা ছাত্রসমাজকে ভয় পায়। বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক একতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কথা বলতে না পারেন, সে কারণেই সরকার ডাকসুর মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করে রাখতে চায়। এ কারণে ডাকসু নির্বাচন দিতে চায় না সরকার। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সরকারের লেজুড়বৃত্তির মাত্রা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনের দুই বছর পূর্তিতে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সদ্য সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হাসান মেহেদী।

 

  • ডাকসুর মাধ্যমে শুরু হওয়া পরিবর্তন থেমে যাওয়ার কারণ কী?

নুরুল হক নুর : দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, কিন্তু সেটিও বন্ধ করে রাখার পাঁয়তারা চলছে। কারণ ডাকসু নির্বাচন হলে আবারও সাধারণ শিক্ষার্থীরাই জয়ী হবে। আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা জয়ী হলে সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হবে। এ কারণেই সরকার ডাকসুর পরে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংসদ কার্যকর করেনি। ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নতুন করে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

 

  •  ডাকসুর নতুন নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীরা নীরব কেন?

নুরুল হক নুর : করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আছে। ফলে নতুন নির্বাচনের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কথা বলার সুযোগ কমে গেছে। আমি মনে করি, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে টালবাহানা করছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে শিক্ষার্থীরা সরকারি মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর অন্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে সরব হব। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে ডাকসুর বিকল্প নেই।

 

  •  ডাকসু কার্যকরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত কী পরিবর্তন হয়েছে?

নুরুল হক নুর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমতসহিষ্ণুতার বড় অভাব ছিল। ছাত্রসংসদ কার্যকর হওয়ার পর সেই বাতাস বইতে শুরু করেছে। গুণগত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেত পারত না। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোও কোণঠাসা হয়ে ছিল। ফলে ছাত্রলীগের একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল ক্যাম্পাসে। সেই জায়গাটিতে পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী হয়েছে, পূর্বের তুলনায় শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আরো বেশি সোচ্চার হয়েছে; অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য। গণরুম ও গেস্টরুম প্রথার কিছুটা হলেও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মন খুলে কথা বলতে পারছে। সেদিক বিবেচনায় পুরোপুরি না হলেও ক্যাম্পাসে কিছুটা হলেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ উন্নত হয়েছে ডাকসু সচল থাকার কারণে।

 

  •  ছাত্রলীগের বাইরে গিয়ে ডাকসুতে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

নুরুল হক নুর : ডাকসু নির্বাচনে সব সময়ই সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের একটা আধিপত্য আমরা লক্ষ করেছি। সেই জায়গা থেকে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের বাইরে গিয়ে তেমন কাজের সুযোগ পাইনি। ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার চেষ্টা করলে সব সময়ই ছাত্রলীগ অসহযোগিতা করেছে। ২৫ জন প্রতিনিধির মধ্যে ২৩ জনই যেহেতু ছাত্রলীগের মনোনীত, সে কারণে তাঁদের অসহযোগিতায় কাজ করতে পারিনি। ছাত্রী হলগুলোতে সাইবার ক্রাইম নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি করতে গেলে সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে বাধা দেওয়া হয়। একাধিকবার চেষ্টা করেও তিনি প্রগ্রামটি সফল করতে পারেননি।

 

  •  কাজ করতে না দেওয়ার কারণ কী?

নুরুল হক নুর : আমাদের দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও আমরা দেশে সংবেদনশীল রাজনীতির চর্চা শুরু করতে পারিনি। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সংঘাতের মাধ্যমে দেশে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফলে নীতি-নৈতিকতা থেকে বিচ্যুতি ঘটছে ছাত্রসংগঠনগুলোর। এরই ধারাবাহিকতায় ডাকসুর মেয়াদ থাকাকালে ২২ ডিসেম্বর (২০১৯) ডাকসু ভবনের ভেতরেই আমার ওপর নগ্ন হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগের দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। এটা আসলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নেরই চিত্র।

 

  • ডাকসুর বাজেটের কেন অডিট হয়নি?

নুরুল হক নুর : দীর্ঘদিন ডাকসু না থাকায় বাজেটের ব্যবহার সম্পর্কে অনেকেই সেভাবে জানত না। তবে যখনই যে সরকারই ক্ষমতায় ছিল, সে সময় সরকারের অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের নিজ দলীয় ছাত্রসংগঠনকে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়ে খুশি রাখত। এই ডাকসুতে আমরা সেই চিত্রই দেখতে পেয়েছি। ডাকসুর বাজেট ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অস্বচ্ছ। নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ছাত্র প্রতিনিধিরা বাজেট ব্যবহার করেছেন। আমি ও সমাজসেবা সম্পাদক যেহেতু কাজের সুযোগ পাইনি, ফলে বাজেটও ব্যবহার করতে পারিনি। একাধিকবার বাজেটের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিষয়টি ডাকসুর সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ও কোষাধ্যক্ষের নজরে আনলেও কোনো সুরাহা হয়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত ঠিকমতো অডিট হয়নি।

 

  • নতুন নির্বাচন আয়োজনে করণীয় কী?

নুরুল হক নুর : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। সরকার না চাইলে নির্বাচন হবে না। ব্যক্তিগতভাবে সিনেট অধিবেশনসহ বিভিন্ন ফোরামে একাধিকবার নতুন নির্বাচনের বিষয়ে উপাচার্যের কাছে দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আশানুরূপ কোনো উত্তর পাইনি। উল্টো এ বিষয়ে কথা বলতে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন তিনি। কারণ সরকার চাচ্ছে না নতুন করে ডাকসু নির্বাচন হোক। তবে শিক্ষার্থীরা যদি চায়, প্রশাসন নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। নতুন নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীদেরই জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীরাই পারবে ডাকসুকে নিয়মিত আয়োজনে পরিণত করতে।

 

কৃতজ্ঞতা: সাক্ষাতকারটি দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ