দেশে মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের মধ্যে দরিদ্র মানুষ বেশি: গবেষণা

ডিউ নিউজ ডেস্ক / ৩১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১
সেমিনারে অতিথিরা।

  • * ৪৬% মামলায় দেখা গেছে, ঘটনার তারিখ থেকে হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি হতে অন্তত ১০ বছর লেগেছে।
  • * হাইকোর্ট বিভাগে মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে সাড়ে পাঁচ বছর সময় লেগেছে।

দেশে গত দুই দশকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং দণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বেশির ভাগ দরিদ্র, স্বল্পশিক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ জনের মামলা নিয়ে করা গবেষণায় এমন তথ্য এসেছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) রাতে ভার্চ্যুয়াল এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে করা গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের উদ্যোগে ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহযোগিতায় গবেষণাটি হয়েছে।

 

গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে একাধিক আইন বিশেষজ্ঞ দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে বলে মত দেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ও সামাজিক অভিঘাত নিয়ে গবেষণা, আলোচনা ও বিতর্কের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. নিজামুল হক বলেন, ‘লোকেরা মনে করে মৃত্যুদণ্ডে অবৈধ কাজ কমায়। আমি তা মনে করি না। মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও অপরাধ হয়, না থাকলেও হয়। এটি কমানোর জন্য সামাজিক সচেতনতা দরকার।’ কোনো অপরাধ হলে ‘ন্যায়বিচার’ চাই বলে দাবি ওঠে। ফাঁসি চাই বলা হয়। মৃত্যুদণ্ড হলেই ন্যায়বিচার হয়েছে বলা যায়? এটি ভয়াবহ অবস্থা, এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১১ জন, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫৭ জন এবং ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ৪৬ শতাংশ মামলায় দেখা যাচ্ছে, ঘটনার তারিখ থেকে হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি হতে ১০ বছরের বেশি সময় লেগেছে। হাইকোর্ট বিভাগে মামলা গড়ে নিষ্পত্তি হতে সাড়ে পাঁচ বছর সময় লেগেছে

 

গবেষণায় বলা হয়, সাধারণ আইনে ৩৩টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এর মধ্যে ১৪টি বিধান ২০০০ সালের পর যুক্ত হয়েছে। ২০১৩ সালে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ জনকে নিয়ে এই গবেষণা হয়েছে। ওই ৩৯ জনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি পরিবার সামাজিকভাবে বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকারও হয়েছে। গবেষণা প্রবন্ধ তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে গবেষণাটি হয়েছে। গবেষণার সময়কাল ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁদের সাজা হয়েছে বা কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় আছে, তাঁদের বেশির ভাগ গরিব ও শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত। তিনি বলেন, শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি আইনের সংস্কার প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আরও বেশি গবেষণা, আলোচনা ও পর্যালোচনা হওয়া দরকার।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, বিশ্বজুড়েই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মৃত্যুদণ্ড বিধান ১০৮টি দেশে বিলুপ্ত করা হয়েছে। দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা কার্যকরে অনেক সময় লাগে। ১৫-২০ বছর পর্যন্ত দণ্ডিত ব্যক্তিকে এ জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এটি তার জন্য বাড়তি শাস্তি হয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ডের বিধান পরিবর্তনের বিষয়টি ভাবার সময় এসেছে।

 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহ, ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন, অধ্যাপক নাইমা হক, বাংলাদেশে সুইডিশ দূতাবাসের (কাউন্সিলর-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রধান) থমাস বামগার্টনার, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের রাজনৈতিক বিভাগের প্রধান আবু জাকি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক গবেষণা ইউনিটের পরিচালক ক্যারোলিন হল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: (প্রতিবেদনটি প্রথম আলো অনলাইনে ১৮ জুন প্রকাশিত হয়েছে।)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ